সমুদ্রপথে পালানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন করে ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলছে, সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের যাতায়াতের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর জানায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলপথে চলাচলের ক্ষেত্রে ২০২৫ সাল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত এক বছরে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় অংশ নিয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজন মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।

ইউএনএইচসিআর আরও জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রপথে যাত্রা করা রোহিঙ্গাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। 

২০২৬ সালেও এই প্রবণতা থামেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র সাড়ে তিন মাসে ২ হাজার ৮০০-এর বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক এই পথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। 

বিবৃতিতে সাম্প্রতিক এক মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা আন্দামান সাগরে উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। এতে আনুমানিক ২৫০ জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় পর, ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বর্তমানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কাউন্সিলিং, চিকিৎসা ও মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, মানব পাচার, চরম শোষণ এবং মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিচ্ছেন। মূলত বাংলাদেশের কক্সবাজার এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌযানগুলো ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ কাজ করছে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং নাগরিকত্ব সংকট রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ সীমিত থাকায় তারা ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি)-এর লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৩ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া গেছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সহায়তা প্রদানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা শরণার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি মানবিক ইস্যু নয়; এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রপথে এই অনিয়ন্ত্রিত যাত্রা মানব পাচার চক্রকে আরও সক্রিয় করে তুলছে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইউএনএইচসিআর বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো মোকাবিলা, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ তৈরি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার না করলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও বিস্তৃত হবে।

একই সঙ্গে সমুদ্রপথে প্রাণহানি রোধ এবং মানব পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। অন্যথায়, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর রোহিঙ্গাদের জন্য আরও বড় একটি ‘মৃত্যুপথে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।