যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষ যখন স্বস্তির কিছু মুহূর্ত কাটানোর চেষ্টা করছিল, তখনই শুরু হলো ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলা। মধ্যরাতে, যখন অনেকেই ঘুমিয়ে বা সাহ্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকে একের পর এক বোমা ফেলা হয়। হতাহত হন নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অসংখ্য ফিলিস্তিনি। মুহূর্তেই আবারও আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে অবরুদ্ধ গাজায়।
১৫ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের হামলায় ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল গাজাবাসীকে। পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছিল, কিন্তু সেই বিরতি ভেঙে নতুন করে রক্তক্ষয়ী অভিযান শুরু করেছে নেতানিয়াহুর সরকার। সোমবার মধ্যরাতে এই বর্বর হামলায় অন্তত ৪০৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ৫৬২ জন আহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
গাজার সর্বত্র হামলা
ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণের খান ইউনিস, রাফা, উত্তরের গাজা নগর ও মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহসহ পুরো গাজা উপত্যকায় হামলা চালায়। হাসপাতাল, আবাসিক ভবন ও শরণার্থী শিবিরেও হামলা হয়েছে।
নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘এটা কেবল শুরু’, অর্থাৎ হামলা আরও চলবে। যদিও ইসরায়েল দাবি করছে, তারা শুধু হামাসকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বাস্তবে এই হামলায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষই প্রাণ হারাচ্ছে।
হামাসের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক নিন্দা
হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। সংগঠনটি বিশ্ববাসীকে এই হামলার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এই হামলা ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও ভয়াবহ দুর্দশা বয়ে এনেছে। যুদ্ধবিরতি মানতে হবে এবং ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়া চলবে না।’
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, হামলার আগে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘হামাস, হুতি ও ইরানকে মূল্য চুকাতে হবে। নরকের দরজা খুলে যাবে।’
ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডান। মিসর বলেছে, এটি যুদ্ধবিরতির চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। চীন ও রাশিয়াও হামলার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ
১৯ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তির আওতায় কিছু জিম্মি বিনিময় হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইসরায়েল অসম্মতি জানিয়ে আসছিল। সোমবার রাতের হামলার পর যুদ্ধবিরতির আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে।
হামাসের মুখপাত্র আবদেল লতিফ বলেছেন, তারা এখনো মূল যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করতে চায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
এদিকে হামলার জবাবে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা, যা ইসরায়েল প্রতিহত করেছে বলে দাবি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্বেগ প্রকাশ করে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে।
গাজার নিরীহ মানুষ আবারও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের কড়া পদক্ষেপ না থাকলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
-পার্বত্য সময়


