২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী পরিচালিত বর্বর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার রোহিঙ্গা। প্রাণের ভয়ে তারা উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ বাস্তবতা— গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হত্যা করা হয়েছে, সংঘটিত হয়েছে গণধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন, ঘরবাড়ি ও সম্পদ লুট করে নেওয়া হয়েছে।

মায়ানমারে রাখাইন রাজ্যের অবস্থান


তবে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান শুনানিতে মিয়ানমার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। সে সময় দেশটির সরকারপ্রধান ও নোবেলজয়ী অং সান সু চি দাবি করেন, অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত এবং ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়ানো। তার মতে, সহিংসতা ছিল আকস্মিক ও কাকতালীয়, বরং রোহিঙ্গারাই নাকি উসকানি দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারকসহ চারজন আন্তর্জাতিক গবেষক একটি বৃহৎ গবেষণা পরিচালনা করেন। মুশফিক মোবারক, যিনি নিজেও বাংলাদেশের নাগরিক, ২০১৯ সালে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে সহকর্মীদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে জরিপ পরিচালনা করেন। তাদের গবেষণায় অংশ নেন ৪ হাজার ৬১৬ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং সমানসংখ্যক স্থানীয় বাংলাদেশি।
গবেষক দলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক জয়া ওয়েন, কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির পলা লোপেজ-পেনা এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সি. অস্টিন ডেভিস। তারা জরিপের পাশাপাশি উপগ্রহচিত্র, আন্তর্জাতিক সংঘর্ষভিত্তিক তথ্যভান্ডার এবং বাজারমূল্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন।
সহিংসতার মূল চালিকা শক্তি: জমি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
গবেষণায় উঠে এসেছে, সহিংসতা কেবল জাতিগত বিদ্বেষ বা সাময়িক উসকানির ফল ছিল না। বরং এর পেছনে কাজ করেছে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক স্বার্থ। বিশেষত ধান চাষের জন্য উর্বর জমি দখল করার উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের গবাদিপশু, কৃষিযন্ত্র এবং জমিজমা দখল করা হয়েছে।
মিয়ানমার মূলত কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে ধান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল। গবেষকরা দেখতে পান, আন্তর্জাতিক বাজারে ধানের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সব এলাকায় সহিংসতা বেড়ে যায়, যেসব অঞ্চল ধান উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধানের আন্তর্জাতিক দাম যদি ২৫তম শতাংশ থেকে ৭৫তম শতাংশে ওঠে, তবে একটি সাধারণ টাউনশিপে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ বেড়ে যায়। একইসঙ্গে সরকার-সমর্থিত বাহিনীর দ্বারা সহিংসতার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ৩৯ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো— লুটপাটের হার বেড়ে যায় তিনগুণ।
গবেষকরা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’ নামক আন্তর্জাতিক ডেটাবেইসের সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্র মিলিয়ে দেখেছেন, রাখাইনে সহিংসতার প্রবণতা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বহুগুণ বেশি। অন্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ হলে প্রতিটি ঘটনায় গড়ে শূন্য দশমিক ৫৮টি পাল্টা হামলা চালিয়েছে সরকার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনায় গড়ে ছয়টি অতিরিক্ত হামলা চালানো হয়েছে, যার অধিকাংশই ছিল নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরিপ ফলাফলেও একই চিত্র উঠে আসে। জরিপে অংশ নেওয়া শরণার্থীদের ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন তারা তাদের গবাদিপশু হারিয়েছেন, ৫৬ শতাংশ কৃষিযন্ত্র হারিয়েছেন এবং ৭৯ শতাংশ জমি হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান সরাসরি মিলে যায় গবেষকদের উপগ্রহচিত্র ও সংঘর্ষ ডেটার বিশ্লেষণের সঙ্গে।
পরিকল্পিত সহিংসতার স্বপক্ষে বিশেষজ্ঞদের অভিমত
সহ-গবেষক পলা লোপেজ-পেনা বলেন, “অন্য সংঘর্ষে সরকার একটি আঘাতের পাল্টা একটি আঘাত করে থাকে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনায় সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অনুপাতহীনভাবে অতিরিক্ত। এটি স্পষ্ট করে যে, নিপীড়ন কেবল প্রতিক্রিয়া নয়, বরং পরিকল্পিত।”
গবেষক সি. অস্টিন ডেভিস মন্তব্য করেন, “সহিংসতা বোঝার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট এবং পরোক্ষ উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য সামাজিক বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।”
এই গবেষণা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণা সাময়িকী ইকোনমিক জার্নাল-এ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। গবেষকরা আশাবাদী, এটি রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
তাদের মতে, এই পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ শুধু মিয়ানমার নয়, বরং দক্ষিণ সুদান, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন কিংবা আফগানিস্তানের মতো সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোতেও প্রযোজ্য হতে পারে। এর মাধ্যমে সহিংসতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।

  • -সূত্র: ইয়েল নিউজ