চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ঠেকাতে গঠিত যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত জোট ‘কোয়াড’-এর বহুল প্রত্যাশিত বৈঠক মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকের আগে থেকেই চার সদস্য দেশের মধ্যে পরস্পর অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বিধা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন জোটটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারতের এস. জয়শঙ্কর, জাপানের তাকেশি ইওয়াইয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার পেনি ওয়াং। তবে, আলোচনার পেছনে ছিল পর্দার আড়ালে চলা চাপা অসন্তোষ ও দ্বিপাক্ষিক মতানৈক্যের ছায়া।
দ্বিধান্বিত ঐক্য, চাপা অসন্তোষ
কৌশলগত দিক থেকে চীনবিরোধী অবস্থান পরিষ্কার হলেও কোয়াডের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বাণিজ্যনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জাপান বৈঠকের ঠিক আগে পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা বৈঠক স্থগিত করে- যা ওয়াশিংটনের জন্য ছিল একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
ভারতও হতাশা গোপন করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলার পর ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ রুখতে নিজের হস্তক্ষেপের’ দাবি করায় নয়াদিল্লি কটাক্ষ করে বলেছে—“ওটা ছিল রাজনৈতিক নাটক, বাস্তবতা নয়।”
অস্ট্রেলিয়াও নিরাপত্তা চুক্তি "আকুস" নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছে। পারমাণবিক সাবমেরিন নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার কথা বলায় ক্যানবেরায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সাবেক অস্ট্রেলীয় রাষ্ট্রদূত আর্থার সিনোদিনোস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকটিকে চীনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বার্তার মঞ্চ বানাতে চাইলেও আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ সেই বার্তাকে ক্ষীণ করে ফেলেছে।”
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস জানিয়েছেন, “কোয়াড বৈঠকে সার্বভৌমত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে চার দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।” কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু ঘোষণায় কিছু হবে না- পড়তে হবে বাস্তব নীতিগত ঐকমত্যে।
নিউ ইয়র্কে দেওয়া এক বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, “সম্পর্কে সমস্যা থাকবেই, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার জন্য চাই পারস্পরিক সম্মান ও সমস্যা মোকাবিলার দক্ষতা।”
কোয়াডকে অনেকে চীনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধ ফ্রন্ট হিসেবে দেখছেন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য এবং সামুদ্রিক সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের মতো উদ্যোগকে ঠেকাতে এই জোটের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকট ও পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি থাকলে সেই প্রতিরোধ কেবল ‘প্রতীকী বার্তা’তে রূপ নিতে পারে।
রয়টার্সের মতে, যতই শক্ত বিবৃতি দেওয়া হোক না কেন, বাস্তব কৌশলগত বিভাজন ও দ্বিধা চীনকে একধরনের কূটনৈতিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্য যখন নতুন করে রূপ নিচ্ছে, তখন কোয়াডের ভিত মজবুত না হলে এটি কার্যকর হয়ে উঠবে না।
-পার্বত্য সময়


