মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ১০২ আসনের মধ্যে ৮৯টিতে জয় পেয়েছে সেনা–সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। সোমবার (৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
২০২১ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। প্রায় পাঁচ বছর পর সামরিক জান্তার অধীনেই এবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দেশের বড় একটি অংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সত্ত্বেও সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার নির্বাচন আয়োজন করেছে। জান্তা কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রে ফেরার প্রক্রিয়া’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ নির্বাচন। প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ করা হয় গত ২৮ ডিসেম্বর। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ফল প্রকাশ শুরু হয় এবং সোমবার প্রথম ধাপের পূর্ণ ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের ১০২ আসনের মধ্যে ইউএসডিপি জয় পেয়েছে ৮৯টিতে, যা মোট আসনের প্রায় ৮৭ শতাংশ। অবশিষ্ট আসনগুলো পেয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
বিশ্লেষক ও গণতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউএসডিপি কার্যত সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক দল। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে সাবেক ও অবসরপ্রাপ্ত বহু সেনা কর্মকর্তার উপস্থিতি রয়েছে।
২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-এর কাছে ইউএসডিপি ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়। সেই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সামরিক বাহিনী ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলে এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে।
অভ্যুত্থানের পর অং সান সু চি ও এনএলডির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং দল হিসেবে এনএলডিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সী অং সান সু চি কারাগারে রয়েছেন।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলেও তা দ্রুত সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। সুচির সমর্থিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের নেতৃত্বাধীন পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ), আরাকান আর্মিসহ একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এই সংঘাতপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করেছে সামরিক জান্তা। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১১ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ এবং ২৫ জানুয়ারি তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ২৫ শতাংশ আসন এবং মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই নির্বাচন বয়কট করেছে। তাদের মতে, এটি সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার আরেকটি কৌশল মাত্র। তাদের ভাষায়, এই নির্বাচন ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ ছাড়া কিছু নয়।
অং সান সু চির কারাবন্দিত্ব, এনএলডির বিলুপ্তি, ভিন্নমত দমনে কঠোরতা এবং সেনা–সমর্থিত দলের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে নির্বাচনটির বৈধতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন তারা।
এদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভোট প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। জান্তা কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, দেশের সব অঞ্চলে ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি এবং বেশ কয়েকটি এলাকা ভোটের বাইরে রাখা হয়েছে।


